মারাকানা এখন আর ব্রাজিলের গর্ব নয়, অভিশাপ। প্রায় ২ লাখ দর্শকের উপস্থিতিতেও চাঙ্গা হতে পারেনি স্বাগতিক ব্রাজিল ফুটবল দল। ৬৪ বছর আগে উরুগুয়ের কাছে হেরে অভিশপ্ত ভেন্যুটির পরিচয় হয়ে গেছে ‘মারাকানাজো’। আধুনিক মারাকানা সংস্কারে পেয়েছে চাকচিক্য, কমেছে আসন। তবে যে ভেন্যুতে স্বপ্নের ফাইনালে ব্রাজিল ফুটবল দলকে দেখতে এত লম্বা প্রস্তুতি স্বাগতিক দর্শকদের-আজ সেই স্তাদিও দো মারাকানার পরিচয়ই কিনা ‘নিরপেক্ষ ভেন্যু’, যে ভেন্যুতে ফাইনালে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা-জার্মানী!

দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপের কোন ফুটবল পাওয়ার হাউজের বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের অতীত নেই-এটাই ল্যাটিনদের গর্ব। দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও বিশ্বকাপ মঞ্চের ফাইনাল মানেই স্বাগতিক দর্শকের নিরংকুশ সমর্থন উপহাদেশের দলটির প্রতি। অথচ, প্রতিবেশি দেশ আর্জেন্টিনাকে সমর্থন নয়, ফুটবলে ব্রাজিলের চিরশত্রু বলেই আজ ব্রাজিলিয়নরা পক্ষ নিবে জার্মানীর! ইউরো পাওয়ার হাউজ জার্মানীর কাছে সেমিফাইনালে ১-৭ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পরও !

অথচ, এই মারাকানায় আজ যে দু’টি দল ফাইনালে, তাদের কাছে ফাইনালটি ফাইনালের চেয়েও বড় কিছু। আর্জেন্টিনার সামনে মারাকানা মেক্সিকোর স্তাদিও আস্তেকা হয়ে যখন ৮৬’র সুখ-স্মৃতি ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তখন জার্মানীকে উদ্বুদ্ধ করছে রোমের স্তাদিও অলিম্পিকে ১৯৯০ বিশ্বকাপ ট্রফি জয়! ৮৬’র ফাইনালে মারাডোনার দলের কাছে ৩-২ গোলে হারের বদলা পরের আসরে (৯০’র বিশ্বকাপ) ১-০ গোলে নিয়েছে ম্যাথিউজের দল। তাই এই ম্যাচে ফুটবল বিস্ময় মেসি’র মারাডোনা হয়ে ওঠা, পরিপূর্ণ তৃপ্তির জন্য ৮৬’র সুখ-স্মৃতি দিচ্ছে প্রেরণা, পাশাপাশি রেফারি কোডেশালের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ৯০’র বিশ্বকাপের ট্র্যাজেডিও দিচ্ছে মনে করিয়ে।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যতটা না ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ, তার চেয়ে বড় শত্রু জার্মানীর। ৮৬ এবং ৯০’র বিশ্বকাপের ২টি ফাইনালই ল্যাটিন এবং ইউরো এই দুই পাওয়ার হাউজের মধ্যে বাড়িয়েছে শত্রুতা, তিক্ততা। হেড টু হেড এ দু’দলের ২০টি লড়াইয়ের মধ্যে আর্জেন্টিনার ৯ জয়ের বিপরীতে জার্মানের জয় ৬টি, অবশিষ্ট ৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে ড্র’এ। তবে বিশ্বকাপে হেড টু হেড অবশ্য এগিয়ে রাখছে জার্মানীকে, যেখানে ৬টি মুখোমুখি লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা হেসেছে মাত্র ১ বার, এবং ওই এক জয়ে ট্রফি (১৯৮৬)! বদলা নিয়েছে জার্মানী পরের আসরেই (১৯৯০), এবং সেটিও ফাইনালে। বিশ্বকাপে সর্বশেষ দেখাও হেসেছে জার্মানী, সেটি ২০১০ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে। ৮৬’র বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক মারাডোনা কোচ হয়ে দেখেছেন আর্জেন্টিনার বিপর্যয় সেই ম্যাচে (৪-০)। তাই মাকানার এই ফাইনালটি ২ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে গণ্য হচ্ছে বদলার ম্যাচ হিসেবে। যেখানে ৩ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানীদের প্রেরণা নিকট অতীত, বিশ্বকাপে হেড টু হেড, সঙ্গে ব্রাজিলিয়ানদের সমর্থন! উপভোগ্য ফাইনালের সব উপকরণই তাই পাচ্ছে দু’দলের সমর্থকরা!

চলমান বিশ্বকাপে গ্রুপ রাউন্ডে ঘানার বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র ম্যাচটি বাদ দিলে ছন্দময় ফুটবলের সেরা বিজ্ঞাপন জোয়াকিম লো’র জার্মানী। পর্তুগালের মতো সমশক্তির দলকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে শুরু তাদের বিশ্বকাপ মিশন। টাইব্রেকার পর্যন্ত টেনে নিতে হয়নি তাদেরকে একটি ম্যাচও। আসরের সর্বাধিক ১৭ গোল তাদেরই। সেখানে ট্রাইব্রেকার ভাগ্যে সেমি’র হার্ডল পেরুনো আর্জেন্টিনার গোল সংখ্যার সমষ্টি ৮টি। মেসিনির্ভর আর্জেন্টিনার বিপরীতে টিম জার্মানীকেই বড় ভয় তাই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের।

লম্বা লম্বা পাস, উইং অ্যাটাকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দেয়ার পরিচিত স্ট্যাটেজির বাইরেও যে কৌশল জানা আছে জোয়াকিম লো’র-সেটাই জানিয়ে দিয়েছে জার্মানী সেমিফাইনালে প্রেসিং ফুটবল খেলে! ৪-২-৩-১ ফরমেশনে জার্মানীর প্রধান ভরসা মিডফিল্ড-যেখানে মেসুত ওজিল, টনি ত্রুজ, সামি খিদিরা, মারিও গোতেজ এর পেছনে আছেন ফিলিপ লাম, বাস্তিন সোয়ানস্ট্্রাইগার। মিরোশ্লাভ ক্লোসার মতো সুযোগ সন্ধানী স্ট্রাইকার যে কোনো সময়ে যেতে পারেন নজর এড়িয়ে। তবে ফাইনালে ডি মারিয়াকে পেয়ে অন্য পূর্ণ শক্তির আর্জেন্টিনাকেই দেখা যাবে আজ। সাবেলার ৪-৩-১-২ ফরমেশনেও প্রধান অস্ত্র মিডফিল্ড। যেখানে গ্যাগা, ডি মারিয়া,আগুয়েরো, ম্যাক্সি রড্রিগেজ, মেসির কম্বিনেশনের পেছনে আছেন চলমান বিশ্বকাপে দুর্দান্ত এক রক্ষণদুর্গ। যেখানে ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন মাসচেরানো, জাবালেতা, হোসে মারিয়া বাসান্তা, মার্কোস রোজো। কোয়ার্টার ফাইনালে স্ট্রাইকার হিগুইনের মেলে ধরাও স্বস্তিতে রাখছে আর্জেন্টিনাকে। সেমিফাইনালে হল্যান্ডের ২টি শট প্রতিহত করায় গোলরক্ষক রোমেরোকে নিয়ে দুর্ভাবনাও কেটেছে অনেকটা।

এমন এক ফাইনালে কাউকে ফেভারিট মানতে রাজি নন আর্জেন্টিনা মিডফিল্ডার রড্রিগেজ-‘এই মুহূর্তে কে ফেভারিট, কে ফেভারিট নয়, তাতে কিন্তু পার্থক্য নিরূপণ করা যাবে না। দু’দলের কাছে তাদের দায়িত্ব নিয়ে খেলাটাই বড়।’ ব্রাজিলের বিপক্ষে ৭-১ গোলে জিতে ছন্দটা এখন ঊর্ধ্বমুখী জার্মানীর। তবে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড আগুয়েরো জার্মানীর ওই বড় জয়ে মোটেও ভীত নন-‘জার্মানী গ্রেট দল। ব্রাজিলের বিপক্ষে যা ঘটেছে, তা অন্য দলের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারত। তবে আমাদের এমন কিছু খেলোয়াড় আছে, যারা উপরের দিকে ভয়ংকর চাপ দিতে পারে। এ জন্যই আমরা কিন্তু ফাইনাল পর্যন্ত এসেছি।’

সেমিফাইনালে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেননি মেসি। তবে তার এই দম নেয়া যে চার বারের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারকে এই ম্যাচে তাঁতিয়ে দিতে পারে, সে শংকা কিন্তু ঠিকই নিয়েছে পিছু জার্মানীর। পর পর ৪ ম্যাচের ম্যান অব দ্য ম্যচ ছন্দ ফিরে পেলে তা হতে পারে জার্মানীর জন্য বিপদ সংকেত, সে কারণেই মেসিকে সতর্ক প্রহারায় রাখাই কথা ভাবছে জার্মানী, থমাস মুলার সেই কৌশল করেছেন প্রকাশ-‘আমরা সারাক্ষণ মেসিকে অনুসরণ করব, এবং তার খেলায় ব্যাঘাত ঘটাব। একটা দল হিসেবে এটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যার একক নৈপুণ্যে, দুর্দান্ত সব পাস আর নিজের বিস্ময়কর গোলে আর্জেন্টিনা এতটা পথ পেরিয়ে এসেছে, সেই মেসি’র অমরত্বের জন্য ট্রফি জয়ে প্রত্যয়ী টিমমেটরা। ডিফেন্ডার জাবালেতা সে ঘোষণাই দিয়েছেন-‘সে আমাদের প্রধান খেলোয়াড়, দলের অধিনায়ক। পুরো দলের নেতা তিনি। ট্রফি উঁচু করে ধরতে পারলে তা কেমন হবে, সেটাই ভাবছি আমরা। ট্রফি উঁচু করে ধরলে সেটাই হবে মেসি’র জন্য দারুণ কিছু। আমরা পা মাটিতে রেখে সেই স্মরণীয় মুহূর্ত উদযাপন করতে চাই।’ ৮৬’র মারাডোনার মতো অধিনায়কের হাতে ট্রফি’র সঙ্গে গোল্ডেন বল-এমন দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় এখন আর্জেন্টিনা সমর্থকরা।

বিশ্বকাপে জার্মানীর ঐতিহ্যের সঙ্গে ফাইনাল দুঃখটাও কম নয়। এই নিয়ে অষ্টম বার ফাইনালে তারা, সর্বশেষ ৭ ফাইনালে হেসেছে সেখানে ৩ বার। ১৯৬৬, ১৯৮২, ১৯৮৬ এবং ২০০২ বিশ্বকাপে ফাইনাল ট্র্যাজেডির কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে তাদের। ১৯৯৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে সর্বশেষ ২০১২’র ইউরো পর্যন্ত ফুটবলের বৃহৎ মঞ্চে শিরোপা জেতার অতীত নেই তাদের-এই অতীতও ভাবনার ব্যাপার। বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর গোলের রেকর্ড (১৫টি) টপকে সর্বাধিক ১৬ গোলের রেকর্ডকে পূর্ণতা দিতে তাই প্রত্যয়ী মিরোশ্লাভ ক্লোসা-‘আমি আর একটি ফাইনালে হার দেখতে চাই না। চাই ট্রফি তুলে ধরতে।’

ঘোষনা দিয়ে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০২’র ফাইনাল ট্র্যাজেডি ভুলতে চান ক্লোসা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে স্বপ্ন দেখানো কোচ সাবেলার বিদায়ী ম্যাচে প্রিয় গুরুকে শিরোপা উপহার দেয়ার প্রত্যয় শিষ্যদের।

ব্রাজিলিয়ানরা আজ জার্মানীর পক্ষ হয়ে যাবে, তা জেনে গেছেন ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়রাও। মারাকানায় আজ দু’পক্ষের সমর্থনে বরং বেশি উৎসাহ পাবে আর্জেন্টিনা দল, এটাই মনে করছেন জাবালেতা-‘আর্জেন্টিনার ফ্যানরা কতটা শিহরিত, পুরো ৯০ মিনিট যেভাবে গান গাইছে, তাতে তাদের জন্য দেশের হয়ে খেলছি আমরা। ব্রাজিলের সমর্থকরা এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ। কখনো কখনো জনগণ বিপক্ষে থাকলে নিজেকে শক্তিশালী মনে হয়। আশা করছি আমরা এ নিয়ে গর্ব অনুভব করার মতো কিছু দেখাতে পারব। খেলার টিকিট না কেটেও আর্জেন্টিনা থেকে পালতোলা নৌকায় এবং গাড়িতে করে আর্জেন্টিনা থেকে আমাদের সমর্থক এসেছে। বিশ্বকাপ জিততে তাদের জন্য বিশেষ কিছু উপহার দিতে পারব আমরা। ’

২৪ বছর পর ফাইনালে আর্জেন্টিনা, বদলার ফাইনালে গণ্য তাদের কাছে ম্যাচটি। অন্যদিকে ১২ বছর পর ফাইনালে জার্মানী, ২০০২’র ট্র্যাজেডি ঘোঁচানোর মিশনও তাদের। মারাকানায় সমর্থকদের বিভক্তিও প্রেরণা দিচ্ছে দল দু’টিকে।

ঢাকা, ১৩ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস