বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এ মামলার ষষ্ঠ দিনের যুক্তিতর্কে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এ শাস্তি দাবি করেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলাটি শুনছেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
‘চার অভিযোগই প্রমাণ করতে পেরেছি’
যুক্তিতর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মামলার সাত আসামির অপরাধ গুরুতর। তাদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় আসামিরা দায়ী। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন। এ কারণে কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
প্রসিকিউশন আরও দাবি করে, আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশনা, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকার ধারাবাহিকতায় আন্দোলন প্রতিরোধে নেতাকর্মীদের রাজপথে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ছয় দিনের যুক্তিতর্কে নানা তথ্য-উপাত্ত
গত ৪ আগস্ট এ মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিন মামলার সামগ্রিক পটভূমি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
এরপর টানা পাঁচ কার্যদিবসে পর্যায়ক্রমে সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউশন দলের সদস্যরা। বুধবার ষষ্ঠ দিনের শুনানিতে প্রথমে আইনি দিকগুলো তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। পরে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্ক শুরু করেন।
ফোনালাপ ও বৈঠকের তথ্য তুলে ধরা হয়
প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিদের সমন্বিত ভূমিকার বিভিন্ন তথ্য আদালতে তুলে ধরা হয়েছে। আন্দোলন প্রতিরোধে নেতাকর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান, বিভিন্ন বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
এ ছাড়া কয়েকজন আসামির বিভিন্ন ফোনালাপও আদালতে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এসব ফোনালাপের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে নির্দেশনা, উসকানি ও সহিংসতার পরিকল্পনার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কয়েকজন আসামির ভূমিকার কথা আদালতে তুলে ধরা হয়। প্রসিকিউশনের বক্তব্য, আসামিদের এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
সাত আসামিই পলাতক
মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক। তারা হলেন-আ’ লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে এসব নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। তবে মামলায় আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আদালতে তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন।
সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৮ জন
এর আগে গত ২ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৮ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ৪ আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করে আসছে। বুধবার প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী যুক্তিতর্ক শুরু করেন।
মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার দিকে এগোবে।
জানুয়ারিতে বিচার শুরু
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা ফরমাল চার্জ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলাটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, আন্দোলন দমনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং সহিংসতার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এখন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের দিকে এগোবে। প্রসিকিউশন সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথি ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করেই মামলার রায় নির্ধারণ করা হবে।
এমএম