নিখোঁজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তির করুণ ইতিহাস
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান হেফজখানায় পড়াশোনা করত। সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে সে প্রথমে কক্সবাজার যায়। সেখানে কিছু তরুণের সঙ্গে পরিচয় হলে ট্রেনের ছাদে চড়ে সে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছায়।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, কমলাপুর থেকে কয়েকজন লোক তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে আটক রাখে, যেখানে আরও অনেক শিশু বন্দি ছিল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখে তার একটি পা নেই। চক্রের সদস্যরা তাকে ট্রেনে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে এবং নিয়মিত হুইলচেয়ারে বসিয়ে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করে। চক্রের নিয়ন্ত্রণে সালমা নামের এক নারীসহ একাধিক সদস্য ছিল, যারা অঙ্গহানি হওয়া শিশুদের ভিক্ষার টাকা প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখত। পরবর্তীতে তাকে বাসে তুলে দিলে সে লোহাগাড়ার চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এসে পৌঁছায়।
মাহফিলে চিনতে পেরে উদ্ধার
গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী শিশু রায়হানকে চিনতে পারেন। কান্নাকাটি অবস্থায় পরিচয় নিশ্চিত হয়ে স্থানীয়রা রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীনকে খবর দেন। খবর পেয়ে বাবা দ্রুত এসে ছেলেকে উদ্ধার করেন। স্বজনদের আকুল কান্নায় সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আইনি সহায়তার অভাব ও পরিবারের আকুতি
ঘটনার পর লোহাগাড়া থানায় গেলেও সঠিক আইনি সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন ও সৎমা ফয়জুন্নেসা। লোহাগাড়া থানা-পুলিশ ঘটনাটি কমলাপুর এলাকার হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দিয়ে অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। হতদরিদ্র পরিবারটি অর্থনৈতিক অক্ষমতার কারণে ঢাকায় গিয়ে মামলা চালানোর সামর্থ্য প্রকাশ করতে পারছে না এবং তারা এই নজিরবিহীন ও চরম মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।
তবে লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, শিশুটির পরিবার ৭ মাস ধরে কোনো জিডি করেনি এবং ঘটনাটি কমলাপুরকেন্দ্রিক হওয়ায় তাদের সেখানকার সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শিশু পাচার ও নিখোঁজের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান এবং চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান এ ঘটনাকে চরম উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএইচআএফ জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২,০৩৮ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে, যাদের সিংহভাগের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, নিখোঁজ শিশুদের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। নিখোঁজ শিশুদের অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষা চক্রের হাত থেকে রক্ষায় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা (মুন অ্যালার্ট) চালু এবং একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ তৈরির জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এমএম





