দেশে আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে বিনিয়োগ। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের উপর। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অস্থিরতা কমলেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখনো চরম আস্থাহীনতায় ভুগছেন। অবকাঠামোগত সমস্যা, জ্বালানি সংকট, বন্দর অব্যবস্থাপনা, সুদের হার বৃদ্ধি, পোশাক শিল্পে অস্থিরতা, সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি হবে তা নিয়ে সন্দেহ-সংকটে সামগ্রিক বিনিয়োগচিত্র হতাশাব্যঞ্জক। আগামীতে ফের রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় নতুন বিনিয়োগে ও দেশের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক মাসেই শুধু বিদেশি বিনিয়োগই কমেছে শতকরা ৮২ ভাগ। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের অবস্থাও নেতিবাচক। আর সামগ্রিক কর্মসংস্থান কমেছে ১৯ শতাংশ। গত আগস্ট মাসের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এছাড়া দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অলস পুঁজি পড়ে আছে। তারল্য বাড়ছেই। দেশের অন্যতম বিনিয়োগ খাত পুঁজিবাজারেও কোন সুখবর নেই। পোশাক খাতে দিনকে দিন রফতানি কমছে। জুলাইয়ে এ শিল্পের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। স্থবির হয়ে পড়েছে বিনিয়োগ । মূলত আস্থাহীনতার কারণে ২০১৩ সাল থেকেই বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করছেন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অন্যথায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে।
বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব মতে, এক মাসের ব্যবধানে স্থানীয় বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান অস্বাভাবিক হারে নেমে গেছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ২৬ শতাংশ। গত জুলাইয়ে স্থানীয় বিনিয়োগ থেকে ১৯ হাজার ৮৭৬ জনের কর্মসংস্থান হয়েছিল। কিন্তু আগস্টে তা কমে নেমেছে ১৪ হাজার ৭৮৯ জনে। এক মাসে স্থানীয় বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় পাঁচ হাজার।
অনুরূপভাবে শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগের নিবন্ধন ও বিনিয়োগ কমে গেছে। গত জুলাইয়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধিত বিনিয়োগ ছিল ১২টি, গত আগস্টে তা নেমেছে পাঁচটিতে। তেমনিভাবে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ জুলাইতে ছিল ১১১৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ ১৪ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার। আগস্টে তা নেমেছে মাত্র আড়াই কোটি ডলারে, যা স্থানীয় মুদ্রায় ২০৩ কোটি টাকা। দেশী-বিদেশী মিলে সার্বিক কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় চার হাজার জনে। গত জুলাইয়ে সার্বিক কর্মসংস্থান হয়েছিল ২০ হাজার ৬৮৩ জন, আগস্টে তা নেমেছে ১৬ হাজার ৭২০ জনে।
টানা ৩ অর্থবছর প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ার পর আবার তা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছর শেষে দেশে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৫ কোটি ডলার। আর ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে তা ছিল ১৭৩ কোটি ডলার। এর ফলে তিন অর্থবছর পর বিদেশী বিনিয়োগ আবার কমে গেল।
অবশ্য এ পরিসংখ্যানটি প্রাথমিক প্রাক্কলন। এটি চূড়ান্ত হবে আগামী জুনের আগে। তথ্য মতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১১৯ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ আসার পর ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ১৭৩ কোটি ডলার। ধারণা করা হয়েছিল, এই ধারাবাহিকতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাস্তবে তা হয়নি, বরং কিছুটা কমে গেছে।
এটা হয়েছে, দেশে গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০১৩) বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছিল। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন ভারসাম্য সারণির তথ্য থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ৮৪ কোটি ডলারের। তবে পরের ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) তা কিছুটা কমে হয় ৭০ কোটি ডলার।
এদিকে চার মাস ধরে তৈরী পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেই চলছে। বিজিএমইএ’র তথ্যে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের এপ্রিল, মে, জুন ও নতুন অর্থবছরের জুলাই মাস পর্যন্ত তৈরী পোশাক শিল্পের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ক্রমাগতভাবে হ্রাস অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া নানা সঙ্কটে গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ৩৯৯টি তৈরী পোশাক কারখানা। এর মধ্যে বিজিএমইএভুক্ত কারখানা বন্ধ হয়েছে ২০৭টি কারখানা। আর বিকেএমইএভুক্ত ১৯২টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। কারখানাগুলোতে প্রায় ২ লাখ শ্রমিক কাজ করতেন।
ওটেক্সার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে এখন চতুর্থ অবস্থানে। শতাংশের হিসাবে দাঁড়িয়েছে ৬.৫ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারি শেষে এ অবস্থান ছিল তৃতীয়। জুন শেষে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে ইন্দোনেশিয়া। যার ৬.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ২০১০ সালে ভয়াবহ ধসের পর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি দেশের পুঁজিবাজার। এরই ধারাবাহিকতায় বাজারে আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে বিদেশী নিট বিনিয়োগ। চলতি বছরের সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে বিদেশী নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসের পর সবচেয়ে কম। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, আগস্ট মাসে বিদেশীরা পুঁজিবাজারে ৩১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করেন।
বিনিয়োগে পিছিয়ে পড়ছে দেশ-এমন মন্তব্য করে খোদ দেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিনিয়োগ বাড়াতে মন্ত্রণালয়ের সচিবদের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্প্রতি সচিবদের কাছে তিনি ১৪ দফার একটি সুপারিশও করেছেন। সুপারিশের প্রথমেই রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিঠিতে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ‘বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো আশানুরূপ পর্যায়ে আসেনি। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এ অবস্থার উন্নয়নে আমাদের সবারই উদ্যোগ নিতে হবে।’
কেন বিনিয়োগ হচ্ছে না এ বিষয়ে উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা প্রায় অভিন্ন উত্তর দিয়েছেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, হরতাল অবরোধের মতো রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি না থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সঙ্কট রয়েছে। তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করতে ভরসা পাচ্ছেন না। কারণ, বিনিয়োগকারীরা চান সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। কিন্ত গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল অনেকটা একতরফা। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা চলমান পরিস্থিতিতে ভরসা পাচ্ছেন না। আর সেই সাথে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটতো রয়েছেই। এর সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করার আগে প্রথমেই আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি, শ্রমিক পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান প্রশাসনের আওতায় কাজ করতে পারবেন কিনা, তা চিন্তা করেন। সে বিষয়গুলো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটতো রয়েছেই। এসব বিষয় বিবেচনায় আনলে বাংলাদেশের প্রতি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামগ্রিক অনাস্থার চিত্রই ফুটে উঠে বলে মন্তব্য করেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলী খান বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য বর্তমানে যে বিষয়গুলো দায়ী, সেগুলো হলো দেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। কাজেই গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্গে বড় বড় যেসব বিনিয়োগ জড়িত, সেসব বিনিয়োগের পরিস্থিতি বর্তমানে খারাপ হতে বাধ্য। এছাড়া বিভিন্ন সমীক্ষাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ার যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়, সেগুলোর দ্রুত উন্নতি করার জন্য জোরালো কোন উদ্যোগ নেই বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত দূর করতে হবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ঘনঘন নীতি পরির্বতনের প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে গতি আনতে হবে।
এক্সপোর্টারর্স এসোয়িশেন অব বাংলাদেশের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী টাইম নিউজ বিডিকে বলেন, একটা দেশে বিনিয়োগের সময় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রধানত ২টি বিষয়কে প্রাধান্য দেয় তার মধ্যে একটি সে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অপরটি অবকাঠমোত সুবিধা। এই দুটোর কোনটাতেই আমরা সুবিধা অর্জন করতে পারিনি। সে কারনে বিদেশী বিনিয়োগ কম হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সালাম বিনিয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এখনো মানুষের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে। কখন কী হয় এ আশঙ্কা থেকে বিনিয়োগমুখী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। যেসব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তারা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অনেকেই লোকসান দিতে দিতে বিনিয়োগ সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এ কারণে সুদের হার কমে গেলেও এবং হরতাল অবরোধ না থাকার পরেও বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটছে না। আর বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ হলো, দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগমুখী না হলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে বা। তবে সবার আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরী বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে হরতাল নয়, বাংলাদেশে বিনিয়োগে বড় বাধা অবকাঠামো অনুন্নয়ন বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার নরলিন ওথম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষা, রাজনীতি, ব্যবসা ও শিল্পকারখানা সবই ঢাকা কেন্দ্রিক। এছাড়াও এখানকার আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও তেমন ভালো নয়। বিনিয়োগ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।
চলতি সপ্তাহে সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
নরলিন ওথম্যান বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার, আইনতও বৈধ। তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হরতালের চেয়েও বড় বাধা অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন।
এ সময় তিনি বিনিয়োগ বাড়াতে আঞ্চলিক পর্যায়ে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে যে কারণ গুলো আছে তা খুঁজে বের করে কিভাবে দূর করা যায়, সরকারকে গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। নইলে বিদেশী বিনিয়োগ এ দেশে কার্যত অস্তিত্ব হারাবে। তখন দেশে সৃষ্টি হবে নতুন নতুন সঙ্কট। দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়ে যাবে। এরাই তখন জন্ম দেবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন।
ঢাকা, ২৪ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমআর





