বাংলাদেশ ব্যাংকেররিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকারচুরির ঘটনার মূল হোতাদের আড়াল করতে নানা বিভ্রান্তিমূলক কৌশলী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই বলছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম সুইফট বার বার দাবি করছে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তাদের সার্ভার হ্যাক হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক সংক্ষেপে ফেড বলছে, যথাযথ নির্দেশনা মেনেই তারা অর্থ ছাড় করেছিল। উপরন্তু ফেডের সতর্কতার কারণে আরো প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা চুরি থেকে তারা রক্ষা করেছে। এমনি পরিস্থিতিতে রিজার্ভ চুরির ঘটনার মূল হোতাদের আড়াল করতে নানা বিভ্রান্তিমূলক কৌশলী প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রচারণার অংশ হিসেবে ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংক শিল্পভবন শাখা থেকে আড়াই লাখ ডলার চুরির ঘটনাকে সুইফট সিস্টেম হ্যাকিংয়ের ফল বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এ দিকে যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রিজার্ভ চুরির মূল হোতারা থাকেন ভারতে। এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা করে। আর এটা একজনের নয়, কয়েকজনের কাজ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক একটি সংবাদ মাধ্যমে এ ঘটনায় বরাবরই সুইফটের দোষ খোঁজার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তারা এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করার চেয়ে বিভিন্ন সংস্থার বরাত দিয়ে সুইফটের দুর্বলতা খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম সুইফট সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেন করা হচ্ছে ১৫ বছর ধরে।
১৫ বছরের এ নিরাপত্তা বলয় ভাঙার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকে কেউ দায়ী কি না সে বিষয়টি উঠে আসছে না ওই সংস্থার প্রতিবেদনে। ফলে বিষয়টি অনেকটা একপেশে হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়াল হয়ে যাচ্ছে কি না সে বিষয়টিও ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে ওই সূত্রটি মনে করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। আর তা হলো, রিজার্ভ চুরির আগে ডিলিংরুমের সিসি ক্যামেরা কেন বিকল ছিল, আর কারা কম্পিউটার থেকে তথ্য মুছে ফেলেছিল। সুইফটের সাথে আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার সময় সুইফটের এন্টিভাইরাস কেন মুছে ফেলা হলো, ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিভাগের কর্মকর্তারা কেন বাধা দিলেন না সেটিরও কোনো উত্তর মিলছে না। সব মিলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়াল হয়ে যাচ্ছে কি না তা-ই এখন চিন্তার বিষয়।
সোনালী ব্যাংকের তিন বছর আগের ঘটনা সুইফটের সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা : সোনালী ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকের শিল্পভবন শাখা থেকে আড়াই লাখ ডলার পরিশোধের জন্য গত ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংক যুক্তরাজ্য শাখায় নির্দেশনা যায়। ওই নির্দেশনা যাচাই-বাছাই না করে যুক্তরাজ্য শাখা থেকে বার্তায় যে গ্রাহকের বিপরীতে পরিশোধ করার কথা বলা হয় ওই গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হয়।
এ ঘটনায় তৎকালীন যুক্তরাজ্য শাখার চিফ অপারেটিং অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়। একইসাথে সোনালী ব্যাংক শিল্প ভবন শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ওই ঘটনাকে এখন সুইফট সিস্টেমে হ্যাক বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ওই গণমাধ্যমে। সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এটার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মূল হোতাদের আড়াল করা হচ্ছে কি না তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক সূত্র জানিয়েছে, মূলত সুইফটের সাথে আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের আগের সিস্টেম সুইফট পদ্ধতি। এ দুর্বলতার সুযোগই কাজে লাগায় দুর্বৃত্তরা। পরে কম্পিউটার ও সার্ভারের তথ্য মুছে ফেলা হয়। এমনটিই ভাবছে তদন্তকারীরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমের সার্ভার ও কম্পিউটারের তথ্য গায়েব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারা এ তথ্য মুছে ফেলল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনার বার্তাগুলো মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গেছে ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে। বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক খোলা হয়। ফলে বার্তাগুলো যাওয়ার পর পাঁচটি বার্তা কার্যকর হয়ে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে যায়।
ওই দিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমে সুইফটের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে কাজ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে সিস্টেমে ঢুকতে আলাদা আলাদা ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড রয়েছে। এই পদ্ধতিতে সিস্টেমে কারা ঢুকল এবং কারা বের হলো সেসব তথ্য ওই সার্ভার ও কম্পিউটারে থাকার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তদন্ত করতে গিয়ে ওইসব তথ্য খুঁজে পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ওই সিস্টেমে ঢুকতে একটি বিশেষ পাসওয়ার্ড বা এক্সেস লগ রয়েছে। ওখানে সব কর্মকাণ্ডের রেকর্ড থাকে। এগুলো কম্পিউটারের পাশাপাশি সার্ভারেও থাকে। কিন্তু ওই সময়ে কারা কাজ করেছে সেসব তথ্য এখন তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র প্রশ্ন করেছে, এসব কিছু ঘটানোর জন্যই কি আরটিজিএস নামক নতুন সফটওয়্যার ইনস্টল করা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।
মূল হোতারা ভারতে : যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মূল হোতারা রয়েছে ভারতে। এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা করে। আর এটা একজনের নয়, কয়েকজনের কাজ।
এতে আরো বলা হয়, এসব হ্যাকারের হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। গত ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে হ্যাকাররা। এর মধ্য থেকে তারা আট কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিতে সমর্থ হয়। এই অর্থ লোপাটের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করছে একাধিক সংস্থা। তবে এখনো পর্যন্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কারো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
মেইল অনলাইনকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই রাজকোষ কেলেঙ্কারি একজনের কাজ নয়। এই কাজে একাধিক ব্যক্তি জড়িত এবং তারা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এর পরিকল্পনা করেছে।
সূত্রটি বলেছে, ‘এতে সংশ্লিষ্টরা ভারতে রয়েছে এবং তারা সম্ভবত প্রক্সি (ইন্টারনেটে নিজের প্রকৃত অবস্থান গোপন করে ভার্চুয়াল অবস্থান দেখানোর পদ্ধতি) ব্যবহার করছে। সে কারণেই তাদের ধরা যাচ্ছে না। তারা ভারতের কেন্দ্রেই অবস্থান করছে এবং কয়েকজন রয়েছে বাইরে। কারিগরি দিক থেকে তারা এতটাই শক্তিশালী যে তাদের সন্ধান পাওয়াই সম্ভব নয়।’ ওই সূত্রটি আরো বলেছে, ‘এসব ব্যক্তি খুব সহজে নিজেদের লুকাতে পারে এবং দু-তিন মিনিটের মধ্যেই হারিয়ে যেতে পারে।’
সূত্রটি জানিয়েছে, কর্তৃপ লোপাট হওয়া অর্থের কিছুটা উদ্ধার করতে পারলেও পুরোটা পারেনি এবং এর হোতাদের সারাজীবন নিশ্চিন্তে পার করে দেয়ার জন্য দেড় কোটি ডলার যথেষ্ট।
এমবি





