চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জসিম উদ্দিনসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক এবং গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

টিকার বাইরে থাকা শিশুদের বড় অংশ

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের ৩০০ জন হামে আক্রান্ত শিশুকে গবেষণার আওতায় নেওয়া হয়। তাদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত। গবেষণাটিতে আর্থিক ও সার্বিক সহায়তা করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আক্রান্ত শিশুদের ৮৫.২ শতাংশই টিকাবিহীন। তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা কিংবা টিকার নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়াকে টিকা না নেওয়ার কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে।

আক্রান্ত শিশুদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১ শতাংশের বয়স ছিল ৬ মাসের কম। ২৩.৫ শতাংশের বয়স ১ থেকে ৫ বছর এবং ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ আক্রান্তদের একটি বড় অংশ নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে।

অপুষ্টিতে বাড়ছে জটিলতার ঝুঁকি

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ শিশুর মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। গবেষণায় অপুষ্টিকে শিশুদের হামের গুরুতর জটিলতায় পড়ার অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত ছয় মাসে মাত্র ৩২.১ শতাংশ শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল। ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ গুরুতর জটিলতায় ভুগেছে।

আক্রান্ত শিশুদের ৭৫.৫ শতাংশ ছিল গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪.৮ শতাংশ এসেছিল নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবারের।

হাসপাতাল থেকেও সংক্রমণের তথ্য

গবেষণায় হামের সংক্রমণের উৎসও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯.৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামের ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৬.৩ শতাংশ শিশু আগে হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিল। ১৮.৯ শতাংশ শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়নি বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

সব নমুনায় ‘বি৩ জেনোটাইপ’

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দিক ছিল ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং। এতে গবেষণার আওতায় থাকা সব নমুনায় ‘বি৩ জেনোটাইপ’ শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ফলাফল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে আগে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

টিকাদান ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জোর

গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং এ রোগে কোনো শিশুর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক শিশু টিকার বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই নির্ধারিত সময়ে সঠিক নিয়মে টিকাদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা, শিশুদের অপুষ্টি কমানো এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদ। তিনি বলেন, গবেষণার ফলাফল শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না রেখে এর উপাত্তকে বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে কাজে লাগাতে হবে। তাঁর মতে, গবেষণার মূল উদ্দেশ্য কেবল তথ্য তৈরি করা নয়, মানুষের জীবন রক্ষা করা।

এস