বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরায় বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে সমালোচিত প্রিয়া সাহা নামের এক নারী। যদিও তার সম্পাদিত পত্রিকায় তার নাম 'প্রিয়া বালা বিশ্বাস'।
তার বাবার বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার চরবানিয়ারী গ্রামে। শ্বশুর বাড়ি বৃহত্তর যশোরে। প্রিয়ার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুদকের সদর দফতরে উপপরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। তার দুই মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী সাহা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশুনা করেন।
বাংলাদেশ বিষয়ে এমন মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য তুলে ধরায় তার বিচার দাবি করে নেটি সমালোচকদের মতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা, বিশেষ করে তার দুই মেয়েকে গ্রিন কার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্য তিনি দেশবিরোধী এ কাজ করেছেন।
তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ -খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আছেন। একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। মাসিক ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের ওই পত্রিকায় প্রিয়া সাহার নাম ‘প্রিয়া বালা’ বিশ্বাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গেল জুন মাসের ১২ তারিখে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল পত্রিকাটি প্রকাশের ঘোষণাপত্র প্রদান করেন। মাসিক পত্রিকা হলেও এর অনলাইন ভার্সন রয়েছে। এতে সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের খবর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
পত্রিকার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ না ছাপানোর অঙ্গীকার করলেও সম্পাদক প্রিয়া সাহা নিজেই রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বক্তব্য রেখেছেন বলে বর্তমানে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া তিনি দলিত সম্প্রদায়দের নিয়ে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘শারি’-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বরত আছেন ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন প্রিয়া সাহা। থাকতেন রোকেয়া হলে। সে সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য গতবছর তাকে মহিলা ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।বর্তমানে ‘শারি’ এনিজিও সংস্থার মাধ্যমে প্রিয়া নিজ এলাকার দলিত সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করেন।
নেটিমহল ছাড়াও নিজ এলাকার স্থানীয় মহলেও ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য কাজ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে চরবানিয়ারীতে প্রিয়ার ভাই জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাসের একটি অব্যবহৃত ঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তখন অভিযোগ ওঠে, পাশের বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান শামীম ঘরটি রাতের আঁধারে পুড়িয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে একটি মন্দিরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেখানে শামীমের একটি মাছের ঘের রয়েছে।
তখন পাল্টা অভিযোগ ওঠেছিল শামীমেরও তিনটি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় চিতলমারী এলাকায়।
পুলিশসহ প্রশাসন এবং পিরোজপুর ও নাজিরপুরের সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে বারবার গিয়ে অনুসন্ধান করে তখন ঘটনার কূলকিনারা খুঁজে পাননি। একপর্যায়ে ঘটনাটি আলোচনার বাইরে চলে যায়। ঘটনাটি নাটক বা সাজানো বলে প্রতিষ্ঠিত হয় পিরোজপুরে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত অসুস্থ থাকায় গত মঙ্গলবার রাতে প্রিয়া সাহা সংগঠনের প্রতিনিধি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
গত ১৬ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে কথা বলেন।
এতে বাংলাদেশি পরিচয়ে প্রিয়া সাহা উপস্থিত হয়ে ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের লোকজনকে সহায়তা করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই।
এরপর তিনি বলেন, এখন সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। আমরা আমাদের বাড়িঘর খুইয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা আমাদের ভূমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিচার পাইনি।
এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই সহানুভূতিশীলতার স্বরূপ এই নারীর সঙ্গে হাত মেলান। এ সময় ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, ‘কারা জমি দখল করেছে, কারা বাড়ি-ঘর দখল করেছে?’
ট্রাম্পের প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘তারা মুসলিম মৌলবাদি গ্রুপ এবং তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সব সময়ই পায়।’
মার্কিন টিভি চ্যানেল এবিসি নেটওয়ার্কের চ্যানেল এবিসি ফোর ইউটাহ ট্রাম্পের সঙ্গে প্রিয়া সাহার সেই সাক্ষাতকারের ভিডিও প্রকাশ করে। এর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেটি।
এদিকে প্রিয়া সাহার এই দেশবিরোধী অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
শুক্রবার (১৯ জুলাই) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে মন্ত্রী বলেন, “আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায় একাধিকবার ভরা হাউসে পৃথিবীর সব দেশের এবং বাংলাদেশ ও বাইরের দেশের মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। যেখানে শ্রদ্ধেয় রানা দাশ গুপ্তার মতো মানুষেরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেয়া প্রিয়া সাহার অভিযোগের মতো কোন অভিযোগ বা প্রশ্ন কাউকে করতে দেখিনি।”
প্রিয়া সাহার উদ্ভট অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানিয়ে শাহরিয়ার আলম আরো বলেন, “তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। তার অভিযোগুলোও সরকার শুনবে এবং খতিয়ে দেখবে।”
তবে এ বিষয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘প্রিয়া সাহা যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। এ বিষয়ে তিনিই ভালো ব্যাখা দিতে পারবেন।’
প্রিয়া সাহা কিভাবে হোয়াইট হাউজের ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন এই প্রশ্নে তিনি বলেন,‘প্রিয়া সংগঠনের ৮ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে একজন। তাকে সংগঠনের পক্ষ থেকে সেখানে পাঠানো হয়নি। ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি কিভাবে সাক্ষাত করেছেন তা আমি জানি না।’ তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, সংবাদ মাধ্যম।
জেড





