আজকেও ভোরে ঘুম থাকি উঠছি। সোবায় মিলি মনের আনন্দে গাছের গোড়াত খুঁটি নাগাওছি।’ হাসিমুখে বললেন খয়বার হোসেন। এক দিন আগে তিনিসহ উপজেলার ৩০ হাজার মানুষ রাস্তার দুই পাশে গাছের চারা লাগিয়েছে। এখন দায়িত্ব সেগুলো বড় করে তোলা। সেই কাজেই এখন ব্যস্ত তারাগঞ্জবাসী।

রংপুরের তারাগঞ্জে ১৫৩টি রাস্তায় লাগানো আড়াই লাখ গাছের চারার পরিচর্যায় এলাকার মানুষ এখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মনের আনন্দে গাছের চারায় খুঁটি লাগাচ্ছে। এক ঘণ্টায় আড়াই লাখ গাছ লাগিয়ে ‘সবুজ তারাগঞ্জ গড়ি’ কর্মসূচি সফল করায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এলাকায় ঘুরে মানুষকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

উপজেলা পরিসংখ্যান অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত তারাগঞ্জ উপজেলার লোকসংখ্যা ১ লাখ ৪২ হাজার ৫১২। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘সবুজ তারাগঞ্জ গড়ি’ কর্মপরিকল্পনার আওতায় ১ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় ৩০ হাজার মানুষ ৪৬০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রোপণ করে আড়াই লাখ গাছ। গাছ লাগানোর পুরো সময়টা প্রশাসন থেকে ভিডিও করা হয়েছে।

আজ শুক্রবার বিকেলে উপজেলার বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে দেখা গেছে, ১৫৩টি রাস্তার দুই পাশ আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি, আমলকী, বাগানবিলাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারায় ভরে গেছে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু গাছ আর গাছ। এ যেন সবুজের সমাহার। আর নিজেদের লাগানো সেসব গাছ পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছে এখানকার মানুষ। কেউ মনের আনন্দে বাঁশের খুঁটি তৈরি করছে। কেউ সেই খুঁটি গাছের চারায় পুঁতে বেঁধে দিচ্ছে। পাঁচটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরাও গাছ পরিচর্যার তদারক করছেন। এক ইউনিয়নের লোকজন অন্য ইউনিয়নের রাস্তায় লাগানো গাছের চারা ঘুরে ঘুরে দেখছে। বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেশাত্মবোধক গান বাজতে দেখা গেছে। এখনো লোকজন গাছ লাগানোর উৎসবের আমেজে মেতে আছে।

ইউএনও জিলুফা সুলতানাকে শুক্রবার ছুটির দিনেও এলাকায় ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে দেখা গেছে।

কুর্শা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজালুল হক বলেন, ‘তারাগঞ্জ এখন সবুজের রাজ্য। এখানে এখন মানুষের চেয়ে গাছের সংখ্যা অনেক বেশি। ১ সেপ্টেম্বর রাতেও ইউএনও পাঁচজন চেয়ারম্যানকে নিয়ে সভা করেছেন। এসব গাছ পরিচর্যার জন্য ইউএনও, কৃষি কর্মকর্তা আমাদের সব সময় পরামর্শ দিয়েছেন।’
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের চিকলী ডাল সড়ক এলাকায় একদল লোককে গাছের চারায় খুঁটি বাঁধতে দেখা গেল। আলমপুর গ্রামের খয়বার হোসেনের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল গাছের চারা পরিচর্যার আনন্দ। তিনি বলেন, ‘আজকেও ভোরে ঘুম থাকি উঠছি। সোবায় মিলি মনের আনন্দে গাছের গোড়াত খুঁটি নাগাওছি।’

উত্তরপাড়া গ্রামের গৃহবধূ দিলরুবা খাতুন বলেন, ‘এই ইউএনও স্যারের কথা হামরা ভুলবার পামো না। স্যারের কথাত সউক রাস্তাত গাছ নাগাছি। এলা সোবায় মিলি নিজের সন্তানের মতো গাছগুলার যত্ন করিছি। গাছগুলা বড় হইলে হামারে কামোত নাগবে।’

মেনানগর গ্রামের ডাঙ্গাপাড়া থেকে চেপচেপি পর্যন্ত রাস্তায় গাছের চারায় খুঁটি বাঁধতে ব্যস্ত বৃদ্ধ মোফাজ্জল হোসেন (৬২)। তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যার হামার গ্রামোত গতকাইল রাইতোত আসি ধন্যবাদ দিয়া হামাক কইচে, রাস্তাত নাগানো গাছগুলো হামার। চিন্তা করি দেখনু স্যারের কথা ঠিক। গাছগুলো বড় হইলে হামারে লাভ হইবে। হামরা এইগলা গাছ থাকি খড়ি পামো, ছাওয়া ছোট ফল খাইবে, গাছ বেচা টাকার ভাগও পামো।’

রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের ১৩ মাইল নামক স্থানে ইউএনওকে গাছের চারায় খুঁটি বাঁধতে দেখা যায়। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারাগঞ্জবাসীকে অভিনন্দন, সালাম ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের রোপণ করা আড়াই লাখ চারা এখন আড়াই লাখ প্রাণ। এসব প্রাণ বাঁচানোর দায়িত্ব সবার। যাঁরা যে গাছ লাগিয়েছেন, তাঁরাই সে গাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করে বড় করে তুলবেন।’
তারাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, ‘যেভাবে তারাগঞ্জবাসী এক ঘণ্টায় আড়াই লাখ গাছ রোপণ করেছে, সেভাবেই এই গাছগুলোকে বড় করতে এগিয়ে আসতে হবে।

 

এসএ