সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলে বাংলাদেশ সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণা দাবি করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা।
সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ডা. মো. আব্দুল মতিন স্বাক্ষরিত বাংলাদেশের ১৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি শনিবার এক বিবৃতিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে অবস্থানের সময় বিশ্ব ঐতিহ্য ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা দেওয়ার জন্য দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবৃতিদাতারা হলেন- এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধুরী, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার, প্রকৌশলী ইনাম উল হক, শামসুল হুদা, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাইফুল হক, ড. মো. শাহজাহান, অধ্যাপিকা এএন রাশেদা, প্রকৌশলী বিডি রহমতউল্লাহ, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ফরিদা আক্তার, ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ও ডা. মো. আব্দুল মতিন।
বিবৃতিতে বিশিষ্টজনেরা বলেন, ‘আমরা জানি যে, বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের অবস্থান দুই দেশের মধ্যে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নানাবিধ কারণে দিন দিন এই সুন্দরবন তার প্রকৃত অবস্থান হারাচ্ছে। তাই মাঝেমধ্যে সুন্দরবন রক্ষা ও বিকাশে বিভিন্ন ধরনের সরকারী-বেসরকারী কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি জনমত ও নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বাংলাদেশে সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে (বনের ১০ কিলোমিটার বাফার জোনকে বন বিবেচনা না করে) ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজও এগিয়ে চলছে।’
ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে প্রতিদিন হাজার হাজার টন মারাত্মক ক্ষতিকর গ্যাস, ছাই, কয়লা, ধোঁয়া, পানি নির্গত হবে; তা সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন করে তুলবে। সম্প্রতি এ অঞ্চলে তেলবাহী ও সারবোঝাই জাহাজ ডুবির ফলে সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়েছে বলে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এ অবস্থা থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সারাবছর ধরে কয়লাবোঝাই জাহাজ চলাচলে দুর্ঘটনার বিরাট ঝুঁকি সহজে অনুমান করা যায়।
বাংলাদেশে সুন্দরবনের সন্নিকটে যে বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে করতে যাচ্ছে, ভারতের কোম্পানি এনটিপিসি এ ধরনের কোন প্রকল্প ভারতে করতে সক্ষম হয়নি। কেননা ভারতের ‘ই আই এ গাইড লাইন ২০১০’ অনুসারে বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যায় না। এমনকি ভারতের পরিবেশ আইন অনুসারে এনটিপিসি’র এ ধরনের একাধিক প্রকল্প বাতিল করতে হয়েছে। অথচ একই নিয়ম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না।
ভারতের নিজস্ব আইন ভঙ্গ করে ভারতীয় কোম্পানির বাংলাদেশে এহেন তৎপরতা ও সুন্দরবন ধ্বংসকারী পদক্ষেপের প্রতি আমরা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা জানি যে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বিকল্প স্থানে করা যেতে পারে। কিন্তু প্রকল্পটি এখানে রেখে সুন্দরবন ধ্বংস হলে তার কোন বিকল্প থাকবে না; একটি সুন্দরবন তৈরি করাও সম্ভব নয়। অথচ সুন্দরবন জলবায়ু হুমকির মুখে আমাদের জন্য ‘অভিযোজন’ ও ‘প্রশমন’ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এক প্রাকৃতিক সম্পদ।
এ ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে তথাকথিত কোন উন্নয়ন প্রকল্প জনকল্যাণ বয়ে আনে না, এতে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সূত্রপাত করবে। তাই আমরা আশা করবো দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎপ্রকল্প বাতিল ঘোষণা এবং দুই দেশের সুন্দরবন রক্ষা ও বিকাশে কর্মসূচি গ্রহণ করবেন।’
এএইচ





