রাজধানী জুড়ে উল্লেখজনকভাবে বেড়েছে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা। আর অজ্ঞানপার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন যারা তারা বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ। পান বিক্রেতা, সিগারেট বিক্রেতা কিংবা লেগুনা বাস ও ট্রেনে যাত্রীবেশে উঠে অজ্ঞানপার্টি তাদের এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে। নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা।
রাজধানীতে চলতি বছরের বিগত কয়েক মাসে অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে সাধারণ মানুষ যেমন খুইয়েছে তাদের সর্বস্ব সম্বল তেমনী মৃত্যুরও ঘটনা ঘটেছে।
তবে জানমাল ও শৃঙ্খলার রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের উর্ধ্বোতন কর্মকর্তারা বলছেন রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম নতুন নয়। পুলিশের তৎপরতায় এদের দৌরাত্ম কমে, আবার পুলিশের তৎপরতা কমে গেলে এদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়।
সম্প্রতি রাজধানীর সাইনবোর্ড এলাকায় গত ২ এপ্রিল অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারান লেগুনা চালক রুবেল ও হেলপার নাজমুল।
শুধু সাইনবোর্ড এলাকা নয়, বিগত কয়েক মাসে রাজধানীতে ৩ শতাধিক ঘটনায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীর সর্বস্ব লুটে নিয়েছে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে মারা যান দেলোয়ার হোসেন(৫৫) নামে এক ফল বিক্রেতা। দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলায়। তিনি রাজধানীর তেজগাঁও নাখালপাড়া টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ভাড়া থাকতেন।
ছেলে সৈয়দ আলী জানান, তার বাবা কারওয়ান বাজার থেকে ফল কিনে মগবাজারে বিক্রি করতেন। ওই রাতের ১২টার দিকে ফল কিনতে কারওয়ান বাজারে গেলে অজ্ঞানপর্টির খপ্পড়ে পড়েন তিনি।
অন্যদিকে গত ৬ মার্চ বনানী থেকে ইসলামপুরে ফেরার পথে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ৫ লাখ টাকা খোয়া যায় মনির হোসেন (২৭) নামে এক কাপড় ব্যবসায়ীর।
ওই ব্যবসায়ীর বড় ভাই নুরে আলম রাজু জানান, ইসলামপুরের মহিউদ্দিন প্লাজায় আইডল কালেকশন দোকানের মালিক তারা।
ক্রেতা পার্টির কাছ থেকে ছয় লাখ টাকার চেক পেয়ে ভাই মনির হোসেনকে বনানীতে ব্যাংকের একটি শাখায় টাকা উত্তোলন করতে পাঠান। ছয় লাখ টাকা থেকে এক লাখ টাকা ব্যাংকের ওই শাখায় উপস্থিত একজনকে দেওয়া হয়। ফেরার পথে গাড়িতে অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে বাকি ৫ লাখ টাকা খোয়া যায়।
গত ১১ মার্চ রাজধানীর রমনা, গুলিস্তান ও শাহবাগ এলাকায় তিনজন অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়েছেন। তারা হলেন- হামিদুর রহমান (৫০), মরণ চন্দ্র দাস (৫২) ও ওয়াহিদুল আলম (৩০)।
ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান রাজধানীর রমনার মগবাজার এলাকায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়েন। এ সময়ে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা তাকে অচেতন করে এক লাখ টাকা ও দুটি দামী মোবাইল নিয়ে যায়।
অপরদিকে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় কলেজ শিক্ষক মরণ চন্দ্র দাস অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়েন। দুপুরে গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের সামনে থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় পেয়ে নাজমুল ইসলাম নামে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
অন্যদিকে শাহবাগ এলাকায় একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ওয়াহিদুল আলম অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে ৭ হাজার টাকা ও দামী দুটি মোবাইল হারান।
অপরদিকে গত ২৪ মার্চ অজ্ঞানপার্টির খপ্পড়ে পড়ে বনানী এলাকায় মোসলেহ উদ্দিন (৩৬) নামে এক ব্যক্তি। অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা অচেতন করে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়। মোসলেহউদ্দিন ফার্মগেট এলাকায় রাজাবাজার কোয়ালিটি ফিড নামে একটি দোকানে চাকরি করতেন।
গত ২৮ মার্চ কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে কর্তব্যরত রেল পুলিশ (জিআরপি)।
রেল পুলিশ জানায়, অজ্ঞাত ওই দুই ব্যক্তি ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলেন। পথিমধ্যে তারা অজ্ঞানপার্টির খপ্পড়ে পড়েন। ট্রেনটি কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালে জিআরপি সদস্যরা ট্রেনের মধ্যে তাদের অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পান।
সম্প্রতি রাজধানীর সাইনবোর্ড এলাকায় গত ২ এপ্রিল অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারান লেগুনা চালক রুবেল ও হেলপার নাজমুল। নেশাদ্রব্য খাইয়ে রোজগারের টাকা ও লেগুনাটি নিয়ে নির্বিঘ্নে কেটে পড়ে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা।
খোয়া যাওয়া লেগুনা মালিক মিজানুর রহমান জানান, এই রুটে অজ্ঞান পার্টির বড় একটি চক্র রয়েছে। চক্রটি চালকদের সঙ্গে কৌশলে সখ্য গড়ে তুলে অজ্ঞান করার দ্রব্য খাইয়ে লেগুনা, সিএনজি বা প্রাইভেটকার-মাইক্রো নিয়ে যায়। তাঁর দাবি এ রুটে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশের টহল নেই বললেই চলে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা তৎপরতা বেশি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ বাস স্টপেজ ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন, কাকরাইল, মালিবাগ, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন জাগায় ছদ্মবেশি অজ্ঞান পার্টি সদস্যদের বিচরণ।
অজ্ঞানপার্টির খপ্পড়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রুস্তম পাটোয়ারি জানান, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা কখনো ডাব বিক্রেতা, কখনো ভ্রাম্যমাণ পান সিগারেটের দোকান, কখনো হকার সেজে এই কাজ করে। তিনি সিগারেট নিতে গিয়ে কল্যাণপুরে তাদের খপ্পড়ে পড়ে দামি মোবাইল হারান।
সায়েদাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী মনসুর জানান, এই এলাকায় পান সিগারেট বিক্রেতার আড়ালে মূলত: অজ্ঞানপার্টির তৎপরতা চলে। টার্গেট করে কেমিক্যাল দেয়া পান-সিগারেটে বিক্রির করে। এরপর পিছু নেয়। অজ্ঞান হয়ে পড়লে দ্রুত সর্বস্ব লুট করে কেটে পড়ে পার্টির সদস্যরা।
এছাড়া পার্টির সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ আছে। লোক টার্গেট করে প্রত্যেকে পিছু নেয়। এরপর সুযোগ বুঝে তারা ওই ব্যক্তির সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এভাবেই রাজধানী জুড়ে এই চক্রটি সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করছে।
রাজধানীর শাহবাগে ফল বিক্রেতা মাসুদ জানান বলেন, এখানেও চক্রটি তৎপর। সুযোগ বুঝে এই চক্রটি ব্যবসায়ীদের সবকিছু লুটে নেয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে অসুস্থ হয়ে সাধারণ মানুষ ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। যারা রাজধানীর কোনো না কোনো জায়গায় অজ্ঞান পার্টির শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) শাহাবুদ্দিন খান টাইম নিউজবিডিকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারী অব্যাহত রয়েছে। অজ্ঞানপার্টিসহ প্রতারক চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বাস টার্মিনালগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারী আরো বৃদ্ধি করা হবে। সব ধরণের প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া রয়েছে।
[b]ঢাকা, জেইউ// 0৭ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// এসএইচ[/b]
জাতীয়
রাজধানীতে বেপরোয়া অজ্ঞানপার্টি
রাজধানী জুড়ে উল্লেখজনকভাবে বেড়েছে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা। আর অজ্ঞানপার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন যারা তারা বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ। পান বিক্রেতা, সিগারেট বিক্রেতা কিংবা লেগুনা বাস ও ট্রেনে যাত্রীবেশে উঠে অজ্ঞানপার্টি তাদের এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে। নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা





