২৭ জানুয়ারি, আজ সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৫ সালের এই দিনে গ্রেনেড হামলায় তাকে চলে যেতে হয়েছে পৃথিবী ছেড়ে।
সেদিন বিকেলে হবিগঞ্জ সদরের বৈদ্যের বাজারে ঈদ পরবর্তী এক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি শাহ এএমএস কিবরিয়া। জনসভা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বক্তব্য শেষে মঞ্চ থেকে নেমে সহকর্মীদের নিয়ে বৈদ্যের বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেইটে আসতেই হঠাৎ বিকট শব্দ। গ্রেনেডের আঘাতে অনেকেই ক্ষতবিক্ষত।
শাহ এএমএস কিবরিয়া ও তৎকালীন জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোঃ আবু জাহিরের প্রচন্ড রক্তক্ষরণ কোন ভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না।
স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করা হলেও হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে না পেরে সিদ্ধান্ত হয় এ্যাম্বুলেন্সে রওয়ানা দেওয়ার। একই অ্যাম্বুলেন্সে করে কিবরিয়া ও আবু জাহিরকে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। পথিমধ্যে আরো একটি অ্যাম্বুলেন্স পেলে তাদেরকে আলাদাভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা যখন অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছায় তখন চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান এমপি বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি মামলা দায়ের করেন। সিআইডি’র তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২০ মার্চ ১ম অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এ অভিযোগপত্রে ২০০৬ সালের ৩ মে সিলেট দ্রুত বিচার আদালতে না-রাজি আবেদন করেন মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান। আদালত তার আবেদন খারিজ করলে হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট অধিকতর তদন্তে রুল জারি করেন। এই রুলের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে সরকার। তা খারিজ হয়ে যায়।
সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২০ জুন আরও ১৪ জনকে আসামী করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া চার্জশীটের উপর হবিগঞ্জ জুডিসিয়াল আদালতে না-রাজি আবেদন করেন। মামলার মূল নথি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে থাকায় বিচারক রাজিব কুমার বিশ্বাস উপনথির মাধ্যমে আবেদনটি সিলেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যাকান্ডের অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্রের নারাজি আবেদন গ্রহণ করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার বণিক। তিনি সিনিয়র পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।
২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে কিবরিয়া হত্যা মামলার ৩য় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি সিলেট অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মেহেরুন নেছা পারুল। অভিযোগপত্রে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। অন্তর্ভূক্ত আসামীরা হলেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজ উদ্দিন, মুফতি সফিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ, হাফেজ ইয়াহিয়া। অভিযোগপত্রে ৩৫ জনকে আসামী ও ১৭১ জনকে সাক্ষী করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মেহেরুন নেছা পারুল।
৩য় দফা সম্পূরক চার্জশীট আদালতে গৃহিত হওয়ার পর ২৮ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ। এর দু’দিন পর ৩০ ডিসেম্বর একই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। কিবরিয়া হত্যা মামলার ৩৫ আসামীর মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবর, মুফতি হান্নান, সিসিক মেয়র আরিফ, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছসহ কারাগারে রয়েছেন ১৪ জন। জামিনে রয়েছেন আব্দুল কাইয়ুমসহ ৮ জন। পলাতক রয়েছেন হারিছ চৌধুরীসহ ১০ জন। আর ৩ জনের অব্যাহতির আবেদন রয়েছে।
শাহ এএমএস কিবরিয়ার ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। পৃথকভাবে এ কর্মসূচিগুলো পালন করবে আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠন এবং কিবরিয়া স্মৃতি সংসদ। এ ছাড়া ঢাকায় মরহুমের গোরস্থানে পুস্পস্তবক অর্পণ করবে কিবরিয়া পরিবার।
আসমা কিবরিয়া জানান, মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি থাকলেও রাজনৈতিক কারণে পুলিশ তার অনুমতি দেয়নি। এ ব্যাপারে ফেব্রুয়ারি মাসে বড় ধরণের কর্মসূচি পালন করা হবে।
কিবরিয়া হত্যাকান্ডের ১০ বছর অতিক্রান্ত হলেও শোক কাটেনি কিবরিয়া পরিবারে। স্ত্রী আসমা কিবরিয়া এ ঘটনায় বিচার বিলম্বের জন্য হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আমি এই হত্যাকান্ডের বিচারের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন অভিযোগপত্র দাখিল ও পরবর্তী কার্যক্রম দেখে কিছুটা আশার আলো দেখতে পেয়েছি। আমি জীবদ্দশায় দোষীদের শাস্তি দেখে যেতে চাই।
১৯৩১ সালের ১ মে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার জালালশাপ গ্রামে শাহ এ এম এস কিবরিয়া জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ ইমতিয়াজ আলী। ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা কিবরিয়াকে ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তার ক্যারিয়ারকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বিদেশে জনমত গঠন করেন।
১৯৯৪ সালে তিনি আওয়ামীলীগে যোগ দেন এবং দলের উপদেষ্টা মনোনীত হন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামীলীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি আওয়ামীলীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি হবিগঞ্জ-৩ (হবিগঞ্জ সদর-লাখাই) আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।
কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া একজন চিত্রশিল্পী। তার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া একজন অর্থনীতিবিদ। তার মাঝে অনেকেই আগামীদিনে কিবরিয়ার ছায়া দেখতে পান। মেয়ে নাজলী কিবরিয়া আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।
এএইচ





