‘লাশ কেন? স্যার আমাদের তো টহল দেয়ার কথা। লাশ তো বহনের কথা না।’ তখন মেজর আরিফ হোসেন ধমক দিয়ে বলেন, ‘আই ব্যাটা চুপ থাক’। আমি যা নির্দেশ দিয়েছি তাই কর।’ তখন লিডিং সি ম্যান আবদুস সামাদ, নায়েক আজম আলী ও আবদুর রাজ্জাক ভয়ে ট্রলারে লাশ উঠিয়ে নিয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের পূর্বে অপহরনের শুরু থেকে লাশ নদীতে ফেলা পর্যন্ত ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দিয়েছেন তৎকালীন র্যাব-১১ এ কর্মরত ৫ সদস্য। ওই সময় তাদের দায়িত্ব ও ঘটনা সম্পর্কে জেরা করেন আসামী পক্ষের আইনজীবীরা।
সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা হতে আড়াইটা পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত ২৩ আসামীর উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহণ করেন। এসময় আদালতে র্যাব-১১ এর নরসিংদি ক্যাম্পের তৎকালীন সময় দায়িত্ব পালনরত মেজর সুরুজ, লাশ বহনকারী ট্রলার চালক ল্যান্স নায়েক আজম আলী, ডিএডি আব্দুস সালাম, লিডিং সিম্যান (এলএস) আ. সামাদ ও নায়েক আ. রাজ্জাক সাক্ষ্য দেন।
র্যাব-১১ এর ডিএডি আবদুস সালাম শিকদার আদালতকে জানান, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সকালে মেজর আরিফ নির্দেশ দেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে চেকপোস্ট বসাতে। দুপুরে ফোন দিয়ে জানান, সাদা ও কালো রংয়ের দুটি প্রাইভেটকার আটকাতে।
দুপুরে ওই দুটি প্রাইভেটকার আটকানোর আগেই মেজর আরিফ হোসেন ও কমান্ডার এম এম রানাকে বহন করা দুটি গাড়ি ওই কালো ও সাদা প্রাইভেটকারের সামনে গিয়ে গতিরোধ করে। তখন দুটি গাড়ি হতে সাতজনকে নামিয়ে একটি নীল রংয়ের হাই এইস গাড়িতে উঠানো হয়।
লিডিং সি ম্যান আবদুস সামাদ, নায়েক আজম আলী ও আবদুর রাজ্জাক আদালতকে জানান, তারা শহরের পুরাতন কোর্ট এলাকাতে অবস্থিত র্যাব-১১ এর ক্যাম্পে ছিলেন। যেটার দায়িত্বে ছিলেন এম এম রানা (র্যাব-১১ এর চাকুরিচ্যুত ও অবসরে পাঠানো নৌ বাহিনীর কমান্ডার)।
সাতজনকে অপহরণের পর রাতে তাদের জানানো হয় ইঞ্জিন চালিত বোট নিয়ে কাঁচপুর যেতে। নির্দেশ মোতাবেক তারা বন্দর ঘাট থেকে কাঁচপুর যায়।
সেখানে ৭ জনের লাশ ওঠানোর সময় এ তিনজন আঁতকে উঠেন। তখন অফিসারদের বলেন, ‘লাশ কেন? স্যার, আমাদের তো টহল দেওয়ার কথা। লাশ তো বহনের কথা না।’
তখন মেজর আরিফ হোসেন বলেন, ‘আই ব্যাটা চুপ থাক। আমি যা নির্দেশ দেই তাই কর।’ পরে ইঞ্জিন চালিত বোটে করে ৭ জনের মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর মোহনাতে নিয়ে ফেলে আসা হয়।
মেজর সুরুজ জানান, নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের কয়েকজন সদস্য নরসিংদি ক্যাম্পে গিয়ে খাবারের জন্য দুই হাজার টাকা চেয়ে নেন। পরে তিনি সাত খুনের বিষয়গুলো জানতে পারেন।
সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা হতে আড়াইটা পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত ২৩ আসামির উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহণ করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) ওয়াজেদ আলী খোকন এর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আগামী সাক্ষ্যগ্রহণ ১৩ জুন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রসঙ্গত ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী ষ্টেডিয়ামের সামনে লিংক রোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এমবি





