বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ ও তাজউদ্দীন খানের পৃথক প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সরকারপ্রধান জানান, সমুদ্র অঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত।
এদিকে স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ১৫০ কূপ
সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলা এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস চিহ্নিত করতে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপও পরিচালনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
কুতুবজোম ও মাতারবাড়িতে নতুন টার্মিনাল
ভবিষ্যতে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ির স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলের উপযুক্ত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
ভোলার গ্যাস শিল্পে সরবরাহের উদ্যোগ
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে শিল্পকারখানায় সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিক শিল্পাঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় লক্ষ্য
বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদের জন্য ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বড় আকারের ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং অ্যাগ্রিভোলটেইক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছাদে সৌরবিদ্যুতে বিশেষ সুবিধা
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনকারীদের জন্য নির্ধারিত প্রণোদনা ও মুনাফা হিসাব করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনকারী গ্রাহকরা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নির্ধারিত দরে বিক্রির সুবিধা পাবেন। এই সুবিধা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে পিপিপি নির্দেশিকা ২০২৬, বেসরকারি বিনিয়োগ নীতিমালা ২০২৫, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ বাস্তবায়নের কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
এস