রোববার (৮ মার্চ) সকাল থেকেই রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় অনেক পাম্পে ‘পেট্রোল নেই’ ও ‘অকটেন নেই’ লেখা পোস্টার ঝুলতে দেখা যায়। এতে করে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গণপরিবহনের চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তেলের সন্ধানে অনেক চালককে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। তেল না পেয়ে কেউ কেউ রাস্তার পাশে বা বন্ধ পাম্পের সামনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। যদিও কিছু পাম্পে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে যানবাহনকে।
সকাল থেকে গাজীপুর ও ঢাকার অন্তত আটটি স্থানে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন কার্যত ফাঁকা। বিক্রয়কর্মীদের পরিবর্তে নিরাপত্তাকর্মীদের বসে থাকতে দেখা গেছে। অনেক পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রবেশপথে দড়ি বা ব্যারিকেড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যেখানে সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে সেখানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। তেলের অভাবে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে কয়েকটি আন্তঃজেলা মিনিবাসকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

গাজীপুরের খাঁপাড়া রোডের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান বলেন, সকাল থেকে চারটি পাম্প ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও এক লিটার তেলও পাইনি। এখন অফিসে কীভাবে যাব বুঝতে পারছি না। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে মনে হচ্ছে।
আরেক চালক আরিফ আহমেদ বলেন, এভাবে চলতে থাকলে গাড়ি রাস্তায় বের করাই কঠিন হয়ে যাবে। যে পাম্পেই যাচ্ছি, সবাই বলছে তেল নেই। এখন গাড়ি কোথায় নিয়ে যাব বুঝতে পারছি না।
একটি ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েকদিন ধরেই তেলের জন্য মানুষের ভিড় বেড়ে গিয়েছিল। অনেকেই ড্রাম বা বড় পাত্রে তেল নিতে চাইছিলেন। গতকালই তাদের পাম্পের মজুত শেষ হয়ে গেছে।
তবে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে মাত্র দুটি ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি থাকায় শত শত চালক সেখানে ভিড় করছেন। চাহিদা বেশি হওয়ায় ওই পাম্পগুলোতে সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই দুই পাম্পের সামনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ চালক লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। পাম্পের সামনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরাপত্তাকর্মীদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
প্রাইভেটকার চালক সোহরাব হোসেন বলেন, সারা শহর ঘুরেও কোথাও তেল পাইনি। শুনলাম এখানে তেল দেওয়া হচ্ছে, তাই লাইনে দাঁড়িয়েছি। দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে, এখনো জানি না কখন গাড়ি পাম্পের কাছে পৌঁছাবে।
এদিকে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সরকার আজ রোববার (৮ মার্চ) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যানবাহনের ধরন অনুযায়ী তেলের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ফিলিং স্টেশনগুলোকে নতুন এই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী— একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লিটার। এসইউভি, জিপ বা মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল দেওয়া হবে।
পরিবহন খাতেও ডিজেল সরবরাহে রেশনিং চালু করা হয়েছে। স্থানীয় রুটের বাস বা পিকআপ ভ্যান দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল পাবে। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনারবাহী লরির জন্য দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা মোকাবিলার অংশ হিসেবেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এনএইচ