দুই দেশের ছিটমহল বিনিময় নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশের ভূমি মন্ত্রণালয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ এবং ভারত দুই দেশের মোট কয়টি ছিটমহল, ছিটমহলগুলোর আয়তন পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল অনুসমর্থনের দলিল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (ভারতে থাকা) পাচ্ছে ভারত এবং ভারতের ১১১টি ছিটমহল (বাংলাদেশের মধ্যে থাকা) পাচ্ছে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশ পাচ্ছে প্রায় ১০ হাজার একর জমি। আর ভারত পাচ্ছে ৭ হাজার একর জমি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৃহস্পতিবার ঢাকায় ছিটমহল-সংক্রান্ত ৩০টি সীমানা মানচিত্রে স্বাক্ষর করেন। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ নিজ নিজ দেশের পক্ষে ওই মানচিত্রে স্বাক্ষর করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরে দুই দেশের ৬৮ বছরের জিইয়ে থাকা স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ঘটে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল অনুসমর্থনের দলিল গত ৬ জুন বিনিময় করেন। ওই সময়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন।

ওই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বাংলাদেশের জন্য আজকের দিনটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিছুক্ষণ (গত ৬ জুন দুপুরে) আগে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনের চুক্তি বিনিময় করেছি। এতে ৬৮ বছরের মানবিক যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখে। স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে অকুণ্ঠ সমর্থন জানানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমানা-সংক্রান্ত সমস্যাসমূহ সমাধানকল্পে ১৬ মে ১৯৭৪ তারিখে স্বাক্ষরিত Land Boundary Agreement 1974 (মুজিব-ইন্দিরা) চুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত প্রটোকলের আলোকে আগামী ৩১ জুলাই ২০১৫ মধ্যরাতে ভূমি বিনিময় সম্পন্ন বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ ৩১ জুলাই-২০১৫ এর মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত সকল ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। একই ভাবে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত সকল বাংলাদেশী ছিটমহল ভারতের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। একই সঙ্গে উভয় দেশের অপদখলীয় জমি সে দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বাংলাদেশে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত জমি সংযুক্ত করে এবং বহির্ভূত জমি বাদ দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ১১১টি ছিটমহলে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিক হিসেবে থাকার অপশন প্রদানকারীগণ ব্যতীত অন্য বাসিন্দাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে।

ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ৩১ জুলাই-২০১৫ মধ্যরাত থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এদের নাগরিকরা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। ১ আগস্ট ২০১৫ ভোরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত ভারতের পূর্ববর্তী ১১১টি ছিটমহলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে। ১ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত ১১১টি ছিটমহলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।

ছিটমহল বিনিময়ের নথিতে বলা হয়েছে, ‘ভারত এবং বাংলাদেশ এই মর্মে সম্মত হয়েছে যে, বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের যে ছিটমহল রয়েছে এবং বাংলাদেশের যে ছিটমহল ভারতের মধ্যে রয়েছে তা ১৯৭৪ সালের চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী বিনিময় হবে, যা ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। ছিটমহলবাসীদের জাতীয়তা এবং নাগরিকত্ব ১৯৭৪ সালের চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

ছিটমহল এলাকায় বসবাসরতরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভের অধিকার পাবেন। নাগরিকত্ব লাভের এই অধিকার তারাই পাবেন যাদের নাম ২০১১ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের যৌথভাবে করা গণনাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ২০১১ সালের শুমারিতে অন্তর্ভুক্তদের পরবর্তী সময়ে প্রসব করা সন্তানরাও এ অধিকার পাবেন। নিরাপদে এবং সহজে ছিটমহলবাসীদের স্থানান্তর এবং তাদের সম্পদের স্থানান্তরের বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারত সরকার নিশ্চিত করবে।’

নথিতে আরও বলা হয়েছে, ‘ছিটমহল থেকে যে সকল অধিবাসী বাংলাদেশ বা ভারতের মূল ভূখণ্ডে বসবাস করতে চান তাদের এই বসবাসের ব্যবস্থা সমঝোতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা করবে, যা ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হলদিবাড়ি, বুড়িবাড়ি এবং বাঙলাবান্ধা এই সীমান্ত দিয়ে এ প্রক্রিয়া কার্যকর হবে। যে কোনো ধরনের সমস্যা ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী সমাধান করা হবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দুই দেশের মানচিত্রও ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী সংশোধন করা হবে। মানচিত্রে সীমানা নির্ধারণের কাজ দুই দেশের সরকারি জরিপ বিভাগ ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করবে।’

ছিটবাসীদের সম্পদ স্থানান্তর সম্পর্কে নথিতে বলা হয়েছে, ‘ছিটমহলবাসীরা ভারত বা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে স্থায়ী সম্পদ হস্তান্তর করতে চাইলে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাইয়ের আগেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রসাশককে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার নিরাপদে স্থায়ী সম্পদ হস্তান্তর বা বিক্রির ব্যবস্থা করবে। দুই দেশের যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সবকিছু চূড়ান্ত করবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত ছিটমহলবাসীদের স্থানান্তর বা এ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে তা দুই দেশের যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ সমাধান করবে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আরও জানা গেছে, প্রকৃত অর্থে গত ৬ জুন ছিটমহল বিনিময় হয়ে গেছে। শুক্রবার মধ্যরাত বা পয়লা আগস্ট একটি প্রতীকী দিন। ওই দিনে ছিটমহল বিনিময় হয়েছে বলে দুই দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে ২০১১ সালের জরিপ অনুসারে ছিটমহলবাসীরা কোন দেশের নাগরিকত্ব নিতে চান তার সুরাহা করা হয়েছে। সামনের আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে যে সকল ছিটমহলবাসী বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত যেতে চান, তাদের ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন করবে। একই ভাবে যে সকল বাসিন্দা ভারত ছেড়ে বাংলাদেশ আসতে চান, তাদের আসার ব্যবস্থা ভারতের সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট করবেন।

এআর