''পাতা ঝরছে পাতা ঝরছে, ঝরছে প্রাণ; পৌষের ঠাণ্ডা হাওয়ায় লেপের ঘ্রাণ; তবু তো শীত ভীত কাঁপানো বাড়ায় হাত...''
কবি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতেও শীত ঋতুটা যেন ‘ব্রাত্যজন'। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর প্রধান তিনটির একটি শীতকাল। শীত হলো সমৃদ্ধির প্রতীক।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “শরত-হেমন্ত-শীতে মানুষের ফসলের ভাণ্ডার। সেই জন্য সেখানে তাহার তিন মহল, ঐখানে তাহার গৃহলক্ষ...”
শরত-হেমন্ত হলো বর্ষা আর শীতের ক্রান্তিকাল। বস্তুত ওই দুই ঋতু ফসলের সমস্ত সম্ভার অবারিত-অকৃপণহাতে শীতের কাছে পৌঁছে দেয়। সে কারণে শীতকাল, বিশেষ করে এর দিনের বেলাটি কর্ম উদ্দীপনায় মুখর। আবার বৈপরীত্য এর রাতে, নির্জনতা স্তব্ধতার কাছে সে তখন নিজেকে সম্পূর্ণ করে।
অবশ্য এই চিরাচরিত্ চিত্রও বদলে যাচ্ছে এখন। রাতও হয়ে উঠছে কর্মময়। শরতেই কুয়াশা পড়া শুরু হয়,হেমন্তে তা গ্রাসকরে গোটা জনপদকে। সূর্য মকরক্রান্তি বরাবর অবস্থান নেয়ার ফলে দিন ক্রমশ ছোট হয়ে আসে। শীতার্ত উত্তরে বাতাস ধেয়ে এসে মানুষের শরীরে যেন হুল ফোটায়।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় হু হু কাঁপন, বাতাসে শীতে গন্ধ। গরম চা আর ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা পথে পথে। বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শীত।
দাপুটে হোক বা দুর্বল, রাজধানীতে কিন্তু শীত নিয়ে রকমারি আয়োজনের কোনো ঘাটতি থাকে না। হেমন্তের শুরু থেকেই পাড়া-মহল্লা, বাজার, অফিস এলাকার ফুটপাত দিয়ে বসে গেছে পিঠা তৈরির দোকান। বিকাল থেকে ভাপা, চিতই, তেলের পিঠা বিক্রি হচ্ছে দেদারসে।
অগ্রহায়ণের পাকা ফসল কৃষিনির্ভর আমাদের জনজীবনে নিয়ে আসে সচ্ছলতা। শীতকালটি তাই আমাদের দেশে আনন্দময়, উৎসবমুখর হয়ে আছে আবহমানকাল থেকে। আবার উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রচণ্ড শীতে দরিদ্র অসহায় মানুষের প্রাণহানিও ঘটে।আনন্দের গায়ে লেগে যায় বিষাদের দাগ। এসব আর্তজনের জন্য সহমর্মিতার হাতও বাড়িয়ে দেন বহু মানুষ।
শীত কেমন- জানতে চাইলে আলীম উদ্দিন বলেন, ‘গরিব মানসের আবার শীত-গরম! বাড়িত লাড়া (খড়) দিয়ে তোসক বানাইছি। পোলাপান নিয়ে জরাইকুড়াই থাহি। কিন্তু তাউ জেন জার (শীত) ছারবের চায় না। তাই রিকশা নিয়ে বাড়াইচি। রিকশার প্যাডেল ঘুরালি ইকটু গরম লাগে।'

বেড়া উপজেলার মাশুমদিয়া ইউনিয়নের পাইকান্দি চরের কৃষক ইউসুফ মৃধার সঙ্গে। তিনি জানান, প্রচণ্ড ঠান্ডা আর কুয়াশায় চরের মানুষের কষ্টের পাশাপাশি কাজকর্মও বন্ধ। ঠাণ্ডারকারণে কৃষিকাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিশ্রমিকেরা চলতি বোরো মৌসুমের ধান রোপণ করতে পারছেন না। পেঁয়াজের চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হরিজন কলোনির নেতা শাওন বাশফোঁড় বলেন, হরিজন সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র। জেলা শহরের দু'টি কলোনিতে দেড় শতাধিক পরিবারের এক হাজার সদস্য রয়েছে। যত শীতই পড়ুক, পানি তাদের নাড়তে হয়ই। ভোরে উঠে বের হতে হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযানে। কিন্তু তাদের খোঁজ কেউ রাখে না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় অনেকেই খুব কষ্টে আছে।
শীতকাল আমাদের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অনুভব উপভোগ, যতটা স্বতন্ত্র, ততটা আলোচ্য বিষয় হিসেবে মূল্য পায়নি। গ্রাম জীবনে শীত আসে নানা মাত্রা নিয়ে। এর সঙ্গে একজন কৃষকের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা যুক্ত, কষ্টের ভেতরেও তার প্রাপ্তি আছে।
ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষী বা দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের জন্য সময়টা নিরানন্দময় তার অর্জনের ভাণ্ড একবারে শূন্য না হলেও চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি নগণ্য। যেখানে শ্রমের বিনিময়ে অর্জন কম, সেখানে ক্লেশের মূল্য কোথায় ?শহরে জন্ম নেয়া মানুষ প্রকৃতির এই রূপ আর রং পরিবর্তনকে ততটা আমলে আনেন না।কেন না তার জীবিকা কিংবা বিত্ত-বেসাতির সঙ্গে ঋতু সরাসরি যুক্ত হয়।

শহুরে লোকের গাঁয়ে শিকড় রয়ে যাওয়া প্রথম প্রজন্মের শীতকে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে দেন না সত্যি,কিন্তু কর্মব্যস্ত সময়ের ভিতর একে নিয়ে দু’দণ্ড তার ভাবার অবসর কোথায়।
এআর





