আমাদের বর্তমান সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার ঘটার পর থেকেই যেকোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে তা যাচাই-বাছাই না করে অন্ধের মতো প্রতিক্রিয়া জানানোর এক অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং এর কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া নানা বিভ্রান্তি আমাদের সমাজের পচনশীল মানসিকতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি নগ্ন রূপ উন্মোচন করেছে। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল একটি ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে, যেখানে দেখা যায় একদল লোক একজন মাদ্রাসা শিক্ষককে বেধড়ক মারধর করছে। এ ধরনের দৃশ্য যখন কারো চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো সুস্থ মানুষের মনে ক্ষোভ এবং বিস্ময় জাগা স্বাভাবিক। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় এতটাই বিভ্রান্তিকর সংবাদ ও ভুয়া তথ্য ছড়ায় যে, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা খুঁজে বের করা অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। টঙ্গীর এই ঘটনাটির ক্ষেত্রেও প্রায় চৌদ্দ থেকে পনেরো ঘণ্টা সময় লেগেছিল আসল সত্য বা রহস্য উদঘাটিত হতে।

তদন্তে ও পরবর্তী তথ্যে জানা যায়, টঙ্গীর ওই মাদ্রাসায় শাহজালাল রুমি নামের এক ব্যক্তি দলবল নিয়ে হামলা চালিয়েছিল এবং মাদ্রাসার একজন শিক্ষককে নির্মমভাবে লাঞ্ছিত করেছিল। অথচ এই ঘটনার শুরুতে তাদের পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এমনভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছিল যে, ওই শিক্ষক নাকি ক্লাস ওয়ানের এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন বা 'সিডিউস' করতে চেয়েছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক পরিচিত মুখও এই খবরটির সত্যতা না জেকে শাহজালাল রুমিকে একজন 'বীর' বানিয়ে পোস্ট শেয়ার করতে শুরু করেন। কিন্তু যখন ঘটনার আসল সত্যটি সামনে এল, তখন দেখা গেল যে পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ক্লাসের একটি ছোট শিশুকে পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে গিয়ে সেই শিক্ষক স্নেহের সুরে বলেছিলেন, আগামীতেও পরীক্ষায় ভালো করলে তাকে 'পাপ্পি' বা চুমু দেওয়া হবে। একজন শিক্ষকের বা একজন পিতার বয়সি মানুষের ছোট শিশুর প্রতি এমন স্বাভাবিক স্নেহ প্রকাশ কোনোভাবেই অপরাধ হতে পারে না।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের সমাজ আজ এমন এক অসুস্থ ও বিকৃত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যেখানে মানুষের মাঝে পর্নোগ্রাফির আসক্তি চরম আকার ধারণ করেছে। সমাজের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা, এমনকি ক্লাস সেভেন-এইটের বাচ্চারা পর্যন্ত এই অন্ধ ও ধ্বংসাত্মক আসক্তির শিকার হয়ে পড়ছে। পর্নোগ্রাফির বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ও বিকৃতির কারণে আজ মানুষের মানসিকতা এত নিচে নেমে গেছে যে, তারা সাধারণ একটি বিষয়কেও অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছে। সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বাবা-মেয়ের বা মা-ছেলের সাধারণ আবেগী মুহূর্ত ও ছবিকে বিকৃত করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কপালে আদরের চুম্বনকে লিপ কিস বানিয়ে প্রচার করার মতো জঘন্য মানসিকতাও আজ মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তথাকথিত সমালোচকরা নিজেদের খুব সৎ, নীতিবান ও ভালো সাজানোর জন্য এসব বিষয় নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে এবং সর্বত্র অশ্লীলতা খুঁজে বেড়ায়। শিশুরা সবসময় বড়দের কাছ থেকে স্নেহ ও আদর প্রত্যাশা করে—যেমনটা অতীতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের এক মায়ের বক্তব্যেও দেখা গিয়েছিল যে তার সন্তান মাদ্রাসায় বা কোচিংয়ে শিক্ষকদের আদর পাওয়ার জন্যই যেতে চাইত। শিশুদের এই মনস্তত্ত্ব না বুঝে আজকের দিনে মানুষের বিকৃত মানসিকতা একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি শিক্ষকের সাধারণ স্নেহকে অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।

এই ঘটনার আরেকটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক দিক হলো শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ও সামাজিক হয়রানির প্রবণতা। আমাদের সমাজে যেমন কিছু শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রছাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার নজির রয়েছে, তেমনি অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের তুচ্ছ ক্ষোভ বা সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিহিংসার কারণেও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা নারী হেনস্থার অভিযোগ আনা হয়। যেমনটি দেখা গিয়েছিল সাতক্ষীরার একটি ঘটনায়, যেখানে শিক্ষকরাই চক্রান্ত করে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে দিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি দেওয়াতেন। এ ধরনের মিথ্যা অপবাদের শিকার হয়ে অনেক সমাজ ও জাতির মানুষ লাঞ্চনায় মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন, অনেকে আবার আত্মহননের পথও বেছে নেন। তাই যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে একপাক্ষিক অন্ধ বিশ্বাস না রেখে ঘটনার গভীরে যাওয়া এবং সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

মানুষের মন থেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সুশাসনের ধারণা মুছে দিয়ে নিজ হাতে আইন তুলে নেওয়ার মানসিকতা তৈরির পেছনে কিছু সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রোপাগান্ডা কাজ করে। সাহিত্য, নাটক ও সিনেমার মাধ্যমে মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয় যাতে তারা বোঝে যে, বিচার পাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা না করে নিজের হাতেই যেন প্রতিশোধ নেওয়া উচিত। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে যেকোনো ঘটনায় অতিমাত্রায় হিংস্র হয়ে উঠছে এবং উগ্র আচরণ প্রদর্শন করছে। সমাজে ভালো সুশাসন থাকলেও তাকে দুঃশাসন হিসেবে প্রতিপন্ন করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা আজ সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়।

টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনার আরও গভীর অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, অভিযুক্ত শাহজালাল রুমির বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে এ ধরনের কোনো অভিযোগ ছিল না এবং তার আচরণও স্বাভাবিক ছিল। বরং মাদ্রাসার ১৭ লাখ টাকার স্থায়ী ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ বা অবৈধ ফায়দা হাসিলের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সে এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে একা আসেনি, বরং সে তার সাথে কিছু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত লোকজনকে নিয়ে মাদ্রাসায় হামলা চালায় এবং শিক্ষকদের ওপর চড়াও হয়ে অত্যন্ত অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।

এখানে একটি অত্যন্ত গভীর ও বিপজ্জনক ষড়যন্ত্রের প্রশ্ন চলে আসে। বিগত বছরগুলোতে পূজা বা বিশেষ সময়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার কিছু কুচক্রী মহল অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে, মাদ্রাসায় হামলার এই ঘটনার সাথে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকজনকে সম্পৃক্ত করে নতুন কোনো অসৎ ফন্দি আঁটা হয়েছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে না জেনে তাৎক্ষণিক আবেগ বা উত্তেজনা প্রকাশ করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ ব্যক্তিগত প্রাইভেসির গণ্ডি পেরিয়ে এক নির্মম অপব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে অন্ধের মতো ভুয়া তথ্য শেয়ার করা এবং অপরাধীকে বীর বানিয়ে প্রচার করা আমাদের চরম নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ দেয়। পবিত্র কোরআন শরীফের সুরা হুজরাতে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোনো সংবাদ পাওয়ার পর তার সত্যতা যাচাই না করে যেন তাড়াহুড়ো করে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা না হয়। তাই আমাদের উচিত গুজবে কান না দিয়ে ধৈর্য ধারণ করা, ঘটনার গভীরে প্রবেশ করা এবং নিজের বা অন্যের কোনো ধরনের ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকা। সবার মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক, আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

  • মামুন মাহফুজ সাংবাদিক ও গবেষক