বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বাজার এলাকায় আয়োজিত বেগম রোকেয়া দিবসের মেলায় আসা একাধিক ব্যবসায়ী ছাত্রদল নেতা মাসুদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার স্মরণে রংপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পায়রাবন্দে তিন দিনব্যাপী মেলা প্রতিবছরই আয়োজন করা হয়ে থাকে। সরকার পরিবর্তনের পর জুলাই সনদপ্রাপ্ত যোদ্ধা ও ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে মেলায় আগত দোকানদারদের নিজের নাম ও মোবাইল নম্বরসম্বলিত চিরকুট দিয়ে গতবছর চাঁদা আদায় করেন ছাত্রদল নেতা মাসুদ রানা। এবছর ৮ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও উপজেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মেলার স্টল বরাদ্দ শুরু হলে ইউপি সচিব শাহাদাতের যোগসাজশে দোকানদারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সরকারি ফি ২,৫০০ টাকার স্থলে ৪,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা আদায় করেন ছাত্রদল নেতা মাসুদের নেতৃত্বে। এছাড়াও সরকার নির্ধারিত স্টলের বাইরে কলেজ মাঠ, স্কুল মাঠ, ডাকবাংলোর সামনে, রাস্তার দুই ধারে স্টল বসিয়ে ও ভ্রাম্যমাণ দোকান দিয়ে লক্ষাধিক টাকার চাঁদা আদায় করেন ছাত্রদল নেতা মাসুদ গং।
সরেজমিনে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার পায়রাবন্দ মেলায় গিয়ে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত স্টেজের পাশে ৭টি ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে দিয়েছেন ছাত্রদল নেতা মাসুদ রানা। এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ দোকানদার মজনু জানান, একটু আগে মাসুদ এসে ১,০০০ টাকা দাবি করে। বলছে টাকা দিতেই হবে। আমাদের এগুলো ভ্রাম্যমাণ দোকান। এসবের কোনো টোকেন নেই। এর আগেও মাসুদ বসাইয়া দিছিলো। গতবার ওরে ৫০০ টাকা দিছিলাম। এবার আবার টাকা চাইতেছে। এখনো দেইনি। টাকা না দিলে দোকান উঠাইয়া দিতে পারে।
আরেক দোকানদার মো. আব্দুর রহিম জানান, মাসুদ এসে বলে আমি জুলাই সনদপ্রাপ্ত যোদ্ধা। টাকা দিতে হবে। পরে কমিটির অন্য লোকজনকে জানাইলে সচিব এসে ২৭৭ নম্বর টোকেন দিয়ে ২,৫০০ টাকা নিয়ে গেছে। বলছে মাসুদকে আর টাকা দিতে হবে না। তারপরেও মাসুদ এসে টাকা নিয়ে গেছে।
ভ্রাম্যমাণ চানাচুরের দোকানদার খবির জানান, আমাকে চেয়ারম্যান এসে জিজ্ঞেস করে এই দোকান কে বসাইছে। আমি তখন চেয়ারম্যানের ভাগনা সুমনের নাম বলি। চেয়ারম্যানের মোটরসাইকেলের পেছনে ভাগনে ছিলো, আমি চিনতে পারিনি। তিনি প্রতিবাদ করলে পরে অনেক কিছু হয়ে যায়। পরে জানতে পারি যিনি দোকান বসাইয়া দিছে তার নাম মাসুদ রানা। এই দোকান থেকেও মাসুদ চাঁদা চাইছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা মো. মাসুদ রানা জানান, আমি ২টা দোকান নিয়েছিলাম। প্রতিবারই আমরা দোকান নিয়ে পরে ব্যবসায়ীদেরকে একটু বেশি দামে বিক্রি করে দেই। এ বিষয়ে স্টল বরাদ্দের আগেই ইউএনও স্যারের সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। এখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের নম্বর নিয়ে রাখে। আওয়ামী লীগ আমলে নেতারা প্রকাশ্যে চাঁদা তুলতো। এখন কোনো চাঁদাবাজি নেই। এবার অনেক দোকান বিক্রি হয়নি। এলাকার ছেলেপেলে ঝালমুড়ির দোকান বসিয়ে দুইশ, পাঁচশ টাকা তুলে চা-নাস্তা খেয়ে ফেলছে। এটাকে চাঁদাবাজি বলা যায় না। এসব নিউজ করে কোনো কাজ হবে না। আমি সচিবকে বলবো, আপনি এসে ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দেখা করিয়েন।
অভিযুক্ত ইউপি সচিব শাহাদাত হোসাইন জানান, আমি সার্বক্ষণিক ইউএনও অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সাথে ছিলাম। সরকার নির্ধারিত ২,৫০০ টাকার টোকেন ছাড়া একটি দোকানও ভাড়া দেওয়া হয়নি। কারো কাছে এক পয়সাও বেশি নেওয়া হয়নি। আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ মাস্তানি করলে সে দায় তো আমার নয়। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো মিথ্যা।
রংপুর জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শরীফ নেওয়াজ জোহা প্রতিবেদককে জানান, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে দেখবো, অভিযোগে সত্যতা আছে কিনা।
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. পারভেজ জানান, অনিয়ম ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও স্থানীয়রা ফাঁকিবাজি করে দোকান বরাদ্দ নিয়ে পরে বেশি দামে বিক্রি করেছে। এ বিষয়টি আমি পরে জানতে পেরেছি। আমরা যেকোনো প্রকার অনিয়ম ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে তৎপর রয়েছি। কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এনএইচ