এ লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় প্রস্তাব দুটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কিনতে ব্যয় হবে ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে সরকার। তবে প্রকল্প দুটির চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি।
পুলিশের যানবাহনসংকট
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার আওতাধীন প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় পুলিশি সেবা দিতে বর্তমানে যানবাহন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি। ফলে প্রতিটি থানায় গড়ে দুটি যানবাহনও নেই।
এ ছাড়া পুলিশের বিদ্যমান যানবাহনের প্রায় ৬৪ শতাংশই ১০ বছরের বেশি পুরোনো। এতে নিয়মিত টহল, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্থানে পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বাহিনীটিকে।
প্রস্তাবিত যানবাহন কেনা হলে পুলিশের চলাচল ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর ফলে অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় বাহিনীটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষায়িত যানবাহনে গুরুত্ব
বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের আওতায় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানবাহন, দুর্গম এলাকায় চলাচলের উপযোগী যান, ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টার এবং অপরাধস্থল পরিদর্শনের জন্য বিশেষ ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব যানবাহন জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা, মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় এবং অপরাধ তদন্তে আলামত সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া নদীপথে পুলিশি কার্যক্রম বাড়াতে স্পিডবোট ও দেশীয় নৌযান কেনার প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব জলযান নৌপথে টহল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও জরুরি উদ্ধারকাজে সহায়তা করবে।
প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা
যানবাহন কেনার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ জনকে হালকা যানবাহন চালনা ও মেকানিকস, ৩০০ জনকে ভারী যানবাহন চালনা ও মেকানিকস এবং আরও ৫০ জনকে যানবাহন মেরামতের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের সরঞ্জাম কেনার জন্য দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পে ৯১০ জন সদস্যকে ড্রাইভিং ও মেকানিকস এবং আরও ৫০ জনকে মেকানিকস প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিন অর্থবছরে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার ৮০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২ হাজার ৮৬৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
উভয় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করেছে ‘হকস বে’। অর্থনৈতিক মূল্যায়নে প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়-সুবিধা অনুপাত ১ দশমিক ০৫ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সমীক্ষার হিসাব অনুযায়ী, প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা আনুমানিক ব্যয়ের চেয়ে সামান্য বেশি।
অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) গত ১৫ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় পর্যালোচনা করা হয়। কমিটির সুপারিশে বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয় এবং প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অর্থ বিভাগের বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সংশোধন করা হয়। প্রকল্পটি নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের পর্যালোচনার পর বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পটি পৃথকভাবে একনেকের বিবেচনার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্প দুটি অনুমোদন পেলে দেশজুড়ে পুলিশের যানবাহন ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এ বিনিয়োগের সুফল কতটা কার্যকরভাবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তা নির্ভর করবে স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী যানবাহন বণ্টন, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত পুলিশি সেবা নিশ্চিত করার ওপর।
এস
















