রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজারো শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

তবে প্রায় সব জায়গাতেই আন্দোলনকারীরা পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। কোথাও লাঠিচার্জ, কোথাও সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করা হয়। তারপরও কর্মসূচি থেমে থাকেনি; বিভিন্ন স্থানে বিকল্প পথ বেছে নিয়ে সমাবেশ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের আগের রাতে টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মুক্তি, গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তি, শিক্ষার্থী হত্যার বিচার এবং দমন-পীড়ন বন্ধসহ ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। ঘোষণার পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি সফল করার প্রস্তুতি শুরু হয়।

বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর হাইকোর্টের মাজার গেট এলাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। কর্মসূচি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই পুলিশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও আন্দোলনকারীরা সেখানেই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যান। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং দাবিগুলো তুলে ধরেন। কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমানসহ কয়েকজন শিক্ষক অংশ নেন। একই সময়ে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের ভেতরে একদল আইনজীবীও মিছিল করে আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

এদিকে আন্দোলনকারীদের আরেকটি মিছিল হাইকোর্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের পথরোধ করে। বাধার মুখে তারা দোয়েল চত্বরে অবস্থান নেন। পরে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশ করেন। বিকেল পর্যন্ত সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে অংশ নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলাভবনের পাশে মহুয়া মঞ্চে সমবেত হয়ে তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পাশাপাশি গণস্বাক্ষর কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারীরা বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

সিলেটে কর্মসূচি ঘিরে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা দেখা দেয়। মিছিল নিয়ে এগোতে গেলে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়। পরে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এতে শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালেও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জেলা থেকে আন্দোলনকারী আটকের খবর পাওয়া যায়।

দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পরদিনের জন্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। সহ-সমন্বয়ক রিফাত রশিদের পাঠানো এক বিবৃতিতে *‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’* শীর্ষক কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে শহীদ ও আহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে স্মৃতিচারণ, চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন, ফেস্টুন এবং ডিজিটাল পোর্ট্রেট তৈরির কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

একই দিনে আন্দোলনকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুই পক্ষ পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে। প্রথমে সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং পরে সম্পাদক শাহ মঞ্জুরুল হক নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরেন। এতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের মধ্যেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়ার কথা থাকা আলোচনা স্থগিত করে। ইইউর এক মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে সহিংসতা ও অস্থিরতার মধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকে বিদেশে চলে যান বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর প্রকাশিত হয়। একই সময়ে দীর্ঘ ১৪ দিন বন্ধ থাকার পর বিকেল তিনটার দিকে বাংলাদেশে আবার চালু হয় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

ছাত্র আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেফতার ও নির্যাতনের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক নিরাপত্তা খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায় নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বেন কার্ডিন ও কোরি বুকার বাংলাদেশে আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেন।

৩১ জুলাই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, সহিংসতার মাধ্যমে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চলছে এবং শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৫ দিনে সারাদেশে গ্রেফতার করা হয় ১০ হাজার ৭৩৫ জনকে। শুধু মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত গ্রেফতার হন আরও ৩৪১ জন। রাজধানীতে গ্রেফতার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজারে।

দিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তন। অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে ডিবির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান।

এদিন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইসের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগতে পারে, সে বিষয়ে জানতে চান।

৩১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, কঠোর পুলিশি বাধা, গণআটক এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি থেকে সরে আসেননি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার পথরোধ করা হলেও তারা বিকল্প স্থানে সমবেত হয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। একই সঙ্গে দেশীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ফলে ৩১ জুলাই শুধু একটি কর্মসূচির দিন নয়, বরং ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

এনএইচ